মোট দেখেছে : 66
প্রসারিত করো ছোট করা পরবর্তীতে পড়ুন ছাপা

সাগরের কোলঘেঁষা এক মায়াবী মসজিদের গল্প

বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মসজিদ রয়েছে। তবে এর মধ্যে অল্পসংখ্যক মসজিদই আছে যেগুলো নির্মাণ এবং স্থাপত্যশৈলীতে নজর কেড়েছে বিশ্ববাসীর। এদের কোনোটি ঐতিহাসিক কারণে বিখ্যাত, আবার কোনোটি অত্যাধুনিক নকশা এবং নির্মাণসামগ্রীর কারণে আলোচিত। তেমনই এক বিখ্যাত মসজিদ হাসান আল-থানি। একে দ্বিতীয় হাসান মসজিদ বলেও ডাকা হয়। লিখেছেন লায়লা আরজুমান্দ


নির্মাণের ইতিহাস

আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে মরক্কোর ক্যাসাব্লাঙ্কা শহরে অবস্থিত এই মসজিদ। এটি মরক্কোর সবচেয়ে বড় মসজিদ। সমুদ্রের কোলঘেঁষে সুউচ্চ মিনারসহ এই মসজিদটি তৈরি করেন রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের বাবা দ্বিতীয় হাসান। তাই এতে দ্বিতীয় হাসান মসজিদ বলেও ডাকা হয়। মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৮৬ সালে। যদিও ১৯৬১ সালে মরক্কোর পঞ্চম রাজা মোহাম্মদের মৃত্যুর পরপরই এটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এরপর ১৯৮৯ সালে এটি উদ্বোধনের কথা থাকলেও নানান কারণে তা পিছিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৩ সালে মসজিদটি উদ্বোধন করা হয়।

মরক্কোর ক্যাসাব্লাঙ্কা অনেক বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক একটি শহর। এই শহরের বেশিরভাগ স্থাপনা সাদা হলেও এই মসজিদের ইমারতগুলো লালচে। রাজা চেয়েছিলেন এমন একটি স্থাপনা তৈরি করতে যেটা কিনা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যেটা হবে ল্যান্ডমার্ক। শহরের যে কোনো জায়গা থেকেও সেটা দেখা যাবে। আর সেই চিন্তা থেকেই নির্মাণ করা হয় এই মসজিদটি। আর সেভাবেই এই মসজিদের নকশা করা হয়। নকশা করেন বিখ্যাত ফরাসি স্থপতি মিশেল প্যাঁসো যিনি সেই সময় মরক্কোতেই থাকতেন। এটি নির্মাণে কাজ করেছেন ফরাসি কোম্পানি বয়গিসের প্রকৌশলীরা।

জনগণের অনুদান

এই মসজিদটি ছিল মরক্কোর ইতিহাসে সব থেকে ব্যয়বহুল মসজিদ। আনুমানিক খরচ ধরা হয়েছিল ৫৮৫ মিলিয়ন ইউরো। তবে এই পরিমাণ অর্থ দেওয়া দেশটির সরকারের পক্ষে ছিল অসম্ভব। কিন্তু মসজিদ তো নির্মাণ করতেই হবে। কী করা যায়! অবশেষে দেশের জনগণের কাছে চাওয়া হলো সাহায্য। আর যারা এই মসজিদে অনুদান দেবেন তাদের দেওয়া হবে সরকারের পক্ষ থেকে একটি করে রসিদ। ধন্যবাদ জানিয়ে দেওয়া হয় একটি করে সার্টিফিকেট। সাহায্য চাওয়ার পর ১ কোটি ২০ লাখ লোক অনুদান দেন মসজিদ নির্মাণে। আর এতে করে যে পরিমাণ অর্থের দরকার ছিল তার অনেকটাই সংগ্রহ করা হয়ে যায়। কিন্তু তখনো ছিল অনেক পথ বাকি। এবার এগিয়ে আসে দেশের বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। এছাড়া আরব রাষ্ট্রগুলোও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। সবার সাহায্য আর অনুদানে আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে নির্মিত হয় এই মসজিদ। মসজিদটির তিনভাগের দুই ভাগ রয়েছে স্থলভাগে আর একভাগ সাগরের পানিতে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় সাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে মসজিদটি দুলছে। আর মুসল্লিরা নামাজ পড়ছেন পানির ওপর। আর এই কারণেই একে বলে ভাসমান মসজিদ।

সর্বোচ্চ মিনার

বিখ্যাত এই মসজিদকে সর্বোচ্চ মিনারের মসজিদও বলা হয়। অনেক দূর থেকেই যেন সবার নজর কাড়ে এমন চিন্তা করেই এই মিনার তৈরি করা হয়েছে। অপূর্ব কারুকার্য-শোভিত এই মিনারের উচ্চতা ৬৯০ ফুট। যা কিনা ৬০ তলা বিল্ডিংয়ের সমান উঁচু। মসজিদের মিনারটি বর্গাকৃতির। সবুজের প্রাধান্য আছে এমন ক্রোমিয়াম ব্যবহার করা হয়েছে মিনারে। এর ফলে মসজিদটি হয়ে উঠেছে অদ্ভুত সুন্দর। ব্যবহার করা হয়েছে ভিন্নধর্মী সবুজ টাইলস। রোদ আর সাগরের পানির মিশেলে এই সবুজ রং কখনো গাঢ় সবুজ, কখনো ফিরোজা, কখনো নীলচে রঙে বদলে যায়। বলা হয়ে থাকে এই মিনার তৈরিতে স্থপতি সমুদ্রের ফেনার জন্য সবুজ এবং আকাশের মতো বিশালতার নীল ব্যবহার করেছেন যা কিনা রাজার বিলাসবহুল জীবনের প্রতীকও। মিনারটির চূড়ায় রয়েছে একটি লেজার বিম। যার আলো বিচ্ছুরিত হয় পবিত্র কাবাঘরের দিকে। সমুদ্রে চলাচলকারী বিভিন্ন জাহাজ সেই আলোকরশ্মি ৩০ কিলোমিটার দূর থেকেও দেখতে পান। এত উঁচু যে মিনার সেটা ঝড় বাতাসে ভেঙে যায় না? এমন প্রশ্ন অনেকেরই মনে আসা স্বাভাবিক। কিন্তু যিনি স্থপতি তিনি এই সমস্যার সমাধানের জন্য ব্যবহার করেছেন বিশেষ এক ধরনের কংক্রিট। যা সাধারণ কংক্রিটের থেকেও বেশি শক্তিশালী। এর ফলে শুধু ঝড় কেন ভূমিকম্পেও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে এই মিনার।

খুলে যায় ছাদ

মসজিদের মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত এর উচ্চতা ৬৫ মিটার। মসজিদটির মাটির নিচে রয়েছে ওজু করার জায়গা। মসজিদের কেন্দ্রীয় হলটির ছাদের পরিধি ৩,৪০০ বর্গ মিটার। কিন্তু এই ছাদের রয়েছে এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য। মসজিদের এই ছাদটি আলো-বাতাস চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে। ৩,৪০০ বর্গ মিটার আকারের এই ছাদটির ১,৭৫০ বর্গ মিটারই উন্মুক্ত হতে পারে। ১,১০০ টন ওজনের এই ছাদটি খুলে যেতে সময় নেয় মাত্র পাঁচ মিনিট। তবে যখন ঝড় কিংবা বৃষ্টি হবে তখন ছাদটি বন্ধই থাকবে। ছাদটি যখন বন্ধ থাকে তখন ভেতরের অংশ আলোকিত হয় ৫০টি ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি দিয়ে। দিনের বেলায় চাইলে সূর্যের আলোয় বা পূর্ণিমা রাতের মোহনীয় পরিবেশে যাতে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করতে পারেন তার জন্যই এই ব্যবস্থা। তেত্রিশ ফুট সামুদ্রিক ঢেউ সামলানোর ক্ষমতা রয়েছে মসজিদটির। নির্মাণ কৌশলের গুণের কারণে মসজিদের ভেতর থেকে সমুদ্রের কোনো গর্জনও শোনা যায় না।

অমুসলিমরাও যেতে পারবেন মসজিদে

মরক্কো ভ্রমণে কেউ গেলে এই মসজিদে একবার ঢুঁ মেরে আসেন অনেকেই। মুসলিম বিশ্বের সর্ব পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত এই মসজিদটি এখন হয়ে উঠেছে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় এক জায়গা। এই মসজিদে অমুসলিমদের জন্যও রয়েছে প্রবেশের সুযোগ। তবে তিনি সেখানে একা প্রবেশ করতে পারবেন না। টিকিট কেটে স্থানীয় ট্যুরিস্ট গাইডের সাহায্য নিয়ে প্রবেশ করতে হবে সেখানে। অমুসলিদের জন্য দিনের মধ্যে কয়েকটি সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। সেই সময় ছাড়া তারা প্রবেশ করতে পারবেন না। মসজিদের আশপাশে এবং পুরো শহরজুড়েই গড়ে উঠেছে ট্যুরিজম ব্যবসা। কেউ যদি মনে করে তাহলে সে বিমানবন্দরে নেমে সেখান থেকেই গাইড নিতে পারবে। তাছাড়া মসজিদের ভেতরেও রয়েছে গাইড। তবে মসজিদে প্রবেশ করতে হলে অবশ্যই শালীন পোশাক থাকা বাঞ্ছনীয়। মেয়েদের স্কার্ফ বা হিজাব পরা বাধ্যতামূলক না তবে তাদের হাঁটু ও হাতের কনুই পর্যন্ত ঢাকা থাকতে হবে। বিভিন্ন দেশের হোটেল রুমে যেমন অফার দেওয়া হয়, সি ভিউ, হিল ভিউ পাওয়া যাবে। তেমনি ক্যাসাব্লাঙ্কার হোটেলগুলোতে অফার দেওয়া মসজিদের মিনারের অপরূপ দৃশ্য দেখা যাবে তাদের হোটেল রুম থেকে। আর সেই রুমগুলোর ভাড়াও অন্য রুমগুলো থেকে বেশি।

নির্মাণশৈলী

বিশাল এই মসজিদটি ২২.২৪ একর জায়গার ওপর অবস্থিত। মসজিদের মূল ভবনের সঙ্গেই রয়েছে লাইব্রেরি, কোরআন শিক্ষালয়, ওজুখানা ও কনফারেন্স রুম। ২৫০০ পিলারের ওপর স্থাপিত এই মসজিদের ভেতরের পুরোটাই টাইলস বসানো। কোথাও কোথাও আবার সোনার পাত দিয়ে মোড়া। মসজিদ এলাকার আশপাশে সাজানো রয়েছে ১২৪টি ঝরনা। রয়েছে ৫০টি ঝাড়বাতি। সমুদ্রের ঢেউ থেকে রক্ষায় এর দু’পাশে তৈরি করা হয়েছে ৩৩ ফুট উচ্চতার দুটি বাঁধ। মসজিদের দেয়ালগুলোতে মার্বেল পাথর বসিয়ে বিভিন্ন নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে গ্রানাইট, প্লাস্টার, মার্বেল, কাঠসহ নানান উপকরণ। এসব উপকরণের বেশিরভাগই সংগ্রহ করা হয়েছে মরক্কো থেকে। তবে কিছু ইতালীয় গ্রানাইটও রয়েছে। মসজিদটির বাইরের প্রাঙ্গণ টাইটানিয়াম, ব্রোঞ্জ এবং গ্রানাইট দ্বারা তৈরি। তাছাড়া নীল রঙের মার্বেল পাথর ও নীল টাইলের ছোঁয়াও রয়েছে সেখানে। মসজিদের নিচে রয়েছে অজুখানা। সেই অজুখানাও অদ্ভুত সুন্দর নকশার।

ইসলামি ক্যালিগ্রাফি ও নকশা

ছয় হাজার কারিগর পাঁচ বছর অক্লান্ত পরিশ্রমে ইসলামি ক্যালিগ্রাফি ও বিভিন্ন নকশা ফুটিয়ে তুলেছেন মসজিদটিতে। কারিগররা এমনভাবে হলরুমের কারুকাজ ফুটিয়ে তুলেছেন, যেটি কাছ থেকে না দেখলে বোঝার কোনো উপায় নেই যে, এটি কতটা নিখুঁতভাবে করা হয়েছে। বিশেষ করে এর ফ্লোর ও ছাদের নকশা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যাবে। মসজিদটির প্রধান নামাজ ঘরে রয়েছে মহিলাদের জন্য নামাজের সুব্যবস্থা। এই মসজিদের যে মূল হলরুমটি রয়েছে তা আয়তাকার। ৬৬০ ফুট লম্বা আর ৩৩০ ফুট চওড়া। এখানে নামাজ পড়তে পারে এক সঙ্গে ২৫ হাজার মানুষ। আর মসজিদের বাইরে ৮০ হাজার লোক নামাজ পড়তে পারে। মসজিদটির হলরুমটির ছাদ রয়েছে ৭৮টি বিশাল স্তম্ভের ওপর। মসজিদটির আকার এত বিশাল যে, এটি পরিষ্কার করার জন্য প্রতিদিন দুইশো লোকের প্রয়োজন হয়। নির্মাণের পর থেকে আজ পর্যন্ত একদিনও বন্ধ থাকেনি এর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ।

লাইব্রেরি ও জাদুঘর

এই মসজিদ এলাকার মধ্যেই তৈরি করা হয়েছে বিশাল এক লাইব্রেরি। যাতে একসঙ্গে ৮৬০ জন লোক বসতে পারবেন। এখানে বসে চাইলে যে কেউ গবেষণার কাজও চালিয়ে নিতে পারবেন। রয়েছে ১০৭টি ওয়ার্ক স্টেশন। লাইব্রেরিতে রয়েছে ইসলামিক চিকিৎসা, ইতিহাস, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ধরনের প্রায় দুই লাখ বই ও দলিল। তিন তলা এই লাইব্রেরিতে শিশুদের জন্যও রয়েছে আলাদা ব্যবস্থা।

এই মসজিদে রয়েছে একটি জাদুঘরও। দর্শনার্থীরা যেখান থেকে টিকিট কেটে মসজিদে প্রবেশ করেন ঠিক তার পাশেই রয়েছে এই জাদুঘর। যদিও সেটি খুব বেশি বড় নয়। তবু এটা সব দর্শনার্থীর কাছে খুবই জনপ্রিয়। এই জাদুঘরে প্রবেশের জন্য কোনো ধরনের ফি দিতে হয় না। এই মসজিদ নির্মাণের ইতিহাস, এর নির্মাণশৈলী, হলরুম, মিনার ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া রয়েছে সেখানে।

সংস্কার

মসজিদটি নির্মাণের পর মাত্র একবার সংস্কার করা হয়েছে। সেটা ২০০৫ সালে। সাগরের বুকে যে অংশটি ছিল সেটার কংক্রিটের বিমগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল নোনা পানির কারণে। আর এ কারণেই সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দেয়। ছিদ্রযুক্ত কংক্রিটের মধ্য দিয়ে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে ইস্পাতগুলোতে মরিচা পড়ে যাচ্ছিল। এরপর প্রায় তিন বছর গবেষণা করে কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করা যায় তার সমাধান বের করেছিল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। আর এই সমস্যা সমাধানের জন্য নকশার বেশ কিছু পরিবর্তন আনতে হয়েছিল।

আরো দেখুন

আরও সংবাদ