মোট দেখেছে : 78
প্রসারিত করো ছোট করা পরবর্তীতে পড়ুন ছাপা

চট্টগ্রামে নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইনের ভয়ে সড়কে কমেছে আনফিট গাড়ি

অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ড্রাইভারদের প্রশিক্ষণ এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন সরিয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ছাড়াই তোড়জোড় শুরু হয়েছে নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়নের। আর যারা এই আইন প্রয়োগ করবেন তাদেরও প্রশিক্ষিত করে প্রস্তুত করা দরকার ছিল। এই আইন সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সবার স্বচ্ছ ধারণা থাকা জরুরি। গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়কে এড়িয়ে আইন প্রয়োগ করার বিষয়টি বাস্তবসম্মত নয় বলে মত দিয়েছেন সড়ক পরিবহন শ্রমিক ও মালিকরা।


এদিকে নতুন আইন কার্যকর হওয়ার আতংকে রোববার (৩ নভেম্বর) নগরীর রাস্তা ছিল অনেকটাই যানবাহনবিহীন। সারাদিনে সড়কে খুব অল্পসংখ্যক গণপরিবহন চলাচল করতে দেখা গেছে।



প্রশ্ন করলে চালকেরা জানান, নতুন আইনে শাস্তি ও জরিমানা বেশি। তাই তারা আতংকে আছেন।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসচালক বলেন, ‘এ আইন বিষয়ে আমরা তেমন কিছুই জানি না। শুধু শুনেছি জরিমানা বেশি, শাস্তি কড়া, মামলা হবে। তবে মনে হচ্ছে এতে অসৎভাবে ঘুষ নেয়ার সুযোগ বাড়লো। কারণ এতো বেশি পরিমাণ জরিমানা দেওয়ার পরিবর্তে হয়তো অবৈধ লেনদেন বেড়ে যাবে।’


জানা গেছে, সড়ক নিরাপত্তা আইন করে প্রয়োগের আগে আইন মানার মানসিকতা সৃষ্টির জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এছাড়া ট্রাফিক বিভাগের সফটওয়্যারও আপডেট করা হয়নি। এতে সড়ক নিরাপত্তার নতুন আইন কার্যকরে জটিলতা দেখা দিয়েছে।


সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ট্রাফিক পুলিশের সফটওয়্যার আপডেট না করায় নতুন হারে জরিমানা আদায় করা যাচ্ছে না। তৈরি হয়নি আইনের প্রয়োজনীয় বিধিমালাও। এমন অবস্থায় আগামী ৭ দিন নতুন আইনে জরিমানা আদায় হবে না বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, ‘আগামী ৭ দিন এই আইনটি নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো হবে। তারপর জরিমানা আদায়সহ অন্যান্য বিধান কার্যকর হবে। তার দাবি এই আইনটি পুরোপুরি কার্যকর হলে সড়ক দুর্ঘটনা কমে যাবে।


১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া নতুন আইন অনুসারে— বিভিন্ন অনিয়মের জন্য জরিমানার পরিমাণ ৫-৫০ গুণ বাড়ানো হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আগের আইনে যত্রতত্র হাইড্রোলিক হর্ন বাজালে ২০০-৫০০ টাকা জরিমানার বিধান ছিলো এখন তা হয়েছে ১০ হাজার টাকা অথবা ৩ মাসের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড।


এই আইনে শুধু চালক ও পরিবহন মালিক নয় এবার পথচারীদেরও শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। চালককে সংকেত মানতে হবে। পথচারীকেও সড়ক, মহাসড়কে জেব্রা ক্রসিং, ওভার ব্রিজ, আন্ডার পাস ব্যবহার করতে হবে। যত্রতত্র রাস্তা পার হলে পথচারীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা গুণতে হবে।


ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো চালক যদি দুর্ঘটনার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটান তাহলে তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মামলা হবে। এর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তবে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর জন্য চালকদের সর্বোচ্চ শাস্তি ৫ বছর এবং এই অপরাধ জামিন অযোগ্য। আগে এই অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি ছিলো ৩ বছরের কারাদণ্ড এবং জামিনযোগ্য।


আইনের নতুন কিছু দিক ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া কেউ যানবাহন চালালে তার শাস্তি ৬ মাসের কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। নিবন্ধনহীন যানবাহনের জন্য শাস্তি ৬ মাসের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য ৫ হাজার টাকা জরিমানা। উল্টো পথে গাড়ি চালালেও জরিমানা গুণতে হবে। এছাড়া ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশন এসব বিষয়েও জরিমানা অনেক বাড়ানো হয়েছে। গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বললে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে ১ মাসের জেল ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা আদায়ের বিধান রয়েছে।


আর দুর্ঘটনায় আহতদের ক্ষতিপূরণ দিতে আদেশ দিতে পারবে কর্তৃপক্ষ। চালকদের সর্বনিম্ন বয়স হতে হবে ১৮ বছর। আইনটি মোটরবাইক থেকে শুরু করে সব ধরনের যান্ত্রিক যানবাহনের জন্য প্রযোজ্য হবে।


চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অতিরিক্ত কমিশনার ট্রাফিকের দায়িত্বে থাকা উপ-কমিশনার হারুণ-উর-রশিদ হাযারী বলেন, ‘নতুন আইন বাস্তবায়নের জন্য আমাদের পজ মেশিনও আপডেট করতে হবে। যানবাহন মালিক ও শ্রমিকদের সচেতন করার জন্য প্রচারণা চালানো হচ্ছে। যানবাহন শ্রমিক সংগঠন গুলোর সাথে বৈঠক করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে চট্টগ্রামে নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়নে মাঠে নামবে ট্রাফিক বিভাগ।’


মেট্রোপলিটন পুলিশের বন্দর ট্রাফিক জোনের উপ-কমিশনার তারেক আহমেদ বলেন, ‘নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন চট্টগ্রামে বাস্তবায়ন হয়ে আগামী সপ্তাহে রোববার বা সোমবার থেকে। কারণ মন্ত্রী বলেছেন এক সপ্তাহ পর বাস্তবায়নের কথা। নতুন আইনটি আগের আইনের মতোই। কিন্তু নতুন আইনে শুধুমাত্র জরিমানার পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। নতুন আইনে আমরা এখনো কোন মামলা দিইনি।’


তিনি বলেন, ‘আইন হওয়ার পরই ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়ক থেকে চলে গেছে। এছাড়াও রাষ্ট্র আইন করেছে, আমরা বাস্তবায়ন করবো। শুরুতে আমরাও একটু শিথিল থাকবো। ধীরে ধীরে কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’


বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন পূর্বাঞ্চলের (চট্টগ্রাম-সিলেট) সভাপতি মৃণাল চৌধুরী বলেন, ‘নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন হয়েছে এতে আমরাও খুশি। এই আইন ঠিক মত কার্যকর হলে সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবে বলে আশা করি।’


তিনি বলেন, ‘নতুন আইনে চালকরা অনেক আতংকিত। আইন অমান্য করলে ৫ বছরের সাজা জামিনযোগ্য নয়। এতে চালকেরা আরো বেশি আতংকিত। আবার ইচ্ছাকৃত দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সরাসারি ৩০২ ধারায় মামলা এটা এ আইনে খুবই অসংগতিপূর্ণ। এখানে ৩০৪ ধারায় মামলা নিয়ে তদন্তসাপেক্ষে ৩০২ ধারায় দেওয়া যায়। এটা আমাদের দাবি।’


তিনি মনে করেন, চালকদের শাস্তি বাড়ানো ও কিছু নিয়ম কঠিন করায় সংকট হতে পারে। কারণ দেশে প্রয়োজনের তুলনায় লাইসেন্সধারী চালক অনেক কম। এতে চালক সংকট দেখা দিতে পারে।


সড়ক পরিহন শ্রমিক নেতা ওসমান আলী বলেন, ‘এই আইনের অনেক ভাল দিক আছে। তবে ১২৫টি ধারার ৫২টিই চালক-শ্রমিকের শাস্তি নিয়ে। খারাপ রাস্তাঘাট, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন আর প্রশিক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না করে চালক-শ্রমিকদের শাস্তির এই বিধান ন্যায্য হয় না।’


এই আইনটি বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে মনে করেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘ফিটনেস না থাকলে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, না দিতে পারলে জেল। এখন পকেটে ২৫ হাজার টাকা তো থাকতে হবে। ১৪ মাস আগে করা এই আইন নিয়ে ব্যাপকভাবে প্রচারের দরকার ছিল। যা করা হয়নি। ফলে বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি হবে।’


তিনি বলেন, ‘জরিমানা দিয়ে আইন মানার মানসিকতা তৈরি করা যায় না। এটি বাস্তবসম্মত নয়। এতোদিন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়নি। হঠাৎ আইন করে তা মানার আশা করা যায় না। আমাদের দাবি ছিল জেলায় জেলায় গণশুনানি করে যথোপযুক্ত আইন করার। কিন্তু আমাদের দাবি উপেক্ষা করা হয়েছে। নতুন এ আইনে আরো অনেক কিছু বিবেচনার দাবি রাখে।’

আরো দেখুন

আরও সংবাদ