মোট দেখেছে : 374
প্রসারিত করো ছোট করা পরবর্তীতে পড়ুন ছাপা

শ্রীমঙ্গলে প্রাচীন গিরিখাতের সন্ধান !

বাবলু আচার্য্য,

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:



সদ্য নামকরণকৃত শ্রীমঙ্গলের নৈস্বর্গিক স্বর্গ উদ্যানে পাওয়া গেছে হাজার বছর পূর্বে সৃষ্টি হওয়া প্রাচীন কয়েকটি গিরিখাত। যার একটিকে স্থানীয়রা নাম দিয়েছেন নিসর্গ গিরিখাত, একটি উল্কা গিরিখাত ও আরেকটি ব্যাকুল গিরিখাত। একই সাথে খুজে পাওয়া গেছে কয়েকটি ছোট ছোট জলপ্রপাত ও ঝর্না। সম্প্রতি পাহাড়ী এলাকায় পর্যটনের রিপোর্ট করতে গিয়ে এ প্রতিবেদকের ক্যামেরায় উঠে আসে পৃথক স্থানে ভিন্ন ভিন্ন সৌন্দর্যে এ গিরিখাত গুলোর চিত্র। যা বিশ্বের অনান্য গিরিখাতের চেয়ে আকর্শনীয়, অনেক সুন্দর ও রোমাঞ্চকর বলে জানান প্রকৃতিপ্রেমীরা। আর শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, এটি অবিকল গিরিখাতের মতো। এ গুলোকে নেনো স্লট গিরিখাত বলা যেতে পারে। তবে দূর্গমতা ও এর প্রকৃতি রক্ষার স্বার্থে এই মুহুর্তে পর্যটকদের এখানে আসা ঠিক হবে না বলে জানান তিনি।

মাসাধিকাল আগে শ্রীমঙ্গলে ক্ষুদ্র নৃ-ত্বাত্তিক জনগোষ্টির শ্রীমঙ্গল উপজেলা সমন্বয়কারী তাজুল ইসলাম জাবেদ জানান, শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ের গভীর অরণ্যে খুব সুন্দর কিছু জায়গা রয়েছে। তিনি ক্ষুদ্র জাতি গোষ্টিকে নিয়ে কাজ করার সময় একবার গভীর জঙ্গলে গিয়ে তা দেখে তার কাছে খুব ভালো লাগে। বিষয়টি এ প্রতিবেদককে জানালে এবং সে স্থানে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিলে তিনি সম্মত হন। দিন ঠিক করে প্রথম দিন মোটর সাইকেল নিয়ে পাহাড়ী এলাকা অতিক্রম করে সিন্দুরখান সীমান্তবর্তী ওই এলাকার সবচেয়ে কাছের জনপদে যাই। সেখান থেকে দুইজন আদিবাসী সন্তান আমাদের সঙ্গী হন। আমাদের টিমে আরো দুইজনসহ মোট ৬ জন মিলে সেখানে রওয়ানা হই। প্রথমে উচু টিলা পরে পাহাড়ী নদী। স্থানীয়ভাবে পাহাড়ী ছড়া বলে। ছড়া দিয়ে হাটতে হাটতে যখন গভীর বনে প্রবেশ করি তখন বনের নিস্তব্ধতা অনুভুত হয়। দু পাশে ঘন জঙ্গল। পথ পদর্শক দুই আদীবাসী সন্তান বারবার বলছিলো সাবধান।এখানে সাপের ভয় রয়েছে। বিভিন্ন পোকাসহ অন্যান্য জীবযন্তুও মাঝেমধ্যে দেখা যায়। আমরা যত ভিতরের দিকে যাচ্ছিলাম ততই ঝির ঝির শব্দ বাড়ছিলো। আর ছড়ার তলদেশে পায়ের নিচে এক সময় বালির পরিবর্তে পাওয়া যায় পাথর। ডানে বায়ে বিভিন্ন স্থানে অনান্য জলপ্রাপাতের ন্যায় পাহাড়ের গা পাথরে পরিনত হয়েছে একটু একটু করে পানিও নিচে নেমে আসছে। বিভিন্ন স্থানে ছড়ায় গাছও মরে পড়ে আছে। কোথাও কোথাও গাছের অংশ পানিতে থাকতে থাকতে ফসিল হয়েগেছে। মাঝে মধ্যে পাখিরও ডাক শোনা যায়। চলার রাস্তাটা এতো রোমাঞ্চকর এর চার পাশ দেখতে দেখতে এবং ছবি উঠাতে উঠাতে অনেক সময় চলে যায় পথেই। হাটতে হাটতে এক সময় চোখে পড়ে গিরিখাত স্বদৃশ্য দু দিকে পাথরের দেয়াল এবং এর তল দেশ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। সরু পথের দিকে যেতে চাইলে গাইড বাঁধা দেয়। তারা বলে এদিকে যাওয়া ঠিক হবেনা। সামনে মুল জায়গা যে জায়গা আমাদের দেখাতে নিয়ে এসেছেন। আমি বললাম এর শেষ কোথায় কোন দিক থেকে এসেছে আর এটা এটাতো দেখতে হুবুহু গিরিখাতের মতো। তাজুল ইসলাম জানান, আমি যেটা দেখাতে নিয়ে যাচ্ছি সেটা এরকমই আরো সুন্দর। এ সময় ধারণা হলো এটা গিরিখাতের শেষ অংশ। ছড়া থেকে উপরের দিকে উঠতে লাগলাম। এক সময় এই গিরিখাতের উপরে চলে যাই। সেখানে গাছ দিয়ে পাহাড়ীরা গিরিখাত পাড় হওয়ার ব্যবস্থা করে রেখেছেন। গিরিখাত পাড় হয়ে একটি জঙ্গলাকৃত পাহাড় অতিক্রম করতে হবে জানান তাজুল ইসলাম। বৃষ্টিতে ভেজা মাটি। তার উপর পাতা লতা পড়ে সার হয়ে আছে ওই পাহাড়ের পদস্পর্শের অংশ। এটি অতিক্রম করতে অনেকটা ভয় করছিলো। তাজুল ইসলাম জানান, মুল জায়গা দেখতে হলে এটা অতিক্রম করতে হবে। এতো কষ্ট করে এসে সেটা দেখবো না তা মেনে নিতেও পারছিলামনা। শেষমেশ মনকে স্থির করলাম উপরওয়ালা ইচ্ছা জঙ্গলাকৃত এই পাহাড় অতিক্রম করে আমরা সেখানে যাবই। আদিবাসী সন্তান দুজন গেলেন না আমরা চারজন পাহাড় অতিক্রম করলাম। পাহাড়ের শেষ প্রান্থে যাওয়ার পর আমাদের চক্ষুতো ছানাবড়া! খাড়া পাথরে আবৃত নিচের অংশ। নিচের দিকে তাকালে অজানা ভয়ের সঞ্চার হয় মনে। তাজুল ইসলাম জানান, নিচে না নামলে ভালোভাবে দেখা যাবেনা। ক্যামেরায় ছবি তুলতে গেলে আলোর সংকট দেখাদেয়। নিচে যাওয়ার জন্য আগ্রহ বাড়ে। একসময় খাড়া পাহারের পাথরের দেয়ালে ধরে ধরে আস্তে আস্তে আমরা নিচে নামি। আমরা যেখানে নামি এই স্থানটি একটু চওড়া। এর ডানে বায়ে দুই পাশই সরু গিরিখাত। ঢালের দিকে প্রবাহমান পানি। আমরা যেখানে নামি এর বা দিকে ঢাল। উপরের দিকে গিরিখাতে গাছ ও ডাল পালা পড়ে তা কিছুটা ভরে গছে। পানি প্রবাহে পাহাড়ের গায়ে পাথরের কারুকাজের সৃষ্টি হয়েছে। দিনের বেলা হলেও ওই জায়গাটি বেশ অন্ধকার। আলো খুব কম পৌছায় সেখানে। সেখানে জীব জন্তু ও সাপের ভয়ের চেয়ে বড় ভয় হলো যে কোন সময় পানি প্রবাহ নেমে আসতে পারে। আর তখন দ্রুত উপরে না উঠতে পারলে নিশ্চিত বিপদ। আসার পথে আদিবাসী সন্তান বাবু সুরং জানায়, পানির স্রোতে সে নিজেও একবার মরতে মরতে বেঁচে গেছে। আমাদের সংগীয় অধ্যাপক রজত শুভ্র চক্রবর্তী জানান, প্রকৃতির সবটুকু সৌন্দর্যই যেন এখানে আড়াআড়ি ভাবে দাড়িয়ে আছে।জায়গাটির অবস্থান জায়গাটির অবস্থান ঢাকা থেকে প্রায় ২১৫ কিলোমিটার, মৌলভীবাজার জেলা শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার ও শ্রীমঙ্গল উপজেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দুুরে। যার অবস্থান ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তবর্তী সিন্দুরখান ইউনিয়নের ঘন জঙ্গলাকৃত পাহাড়ী এলাকায়। প্রথমে জীপ বা মটর সাইকেল নিয়ে তার পর পায়ে হেঁটে কয়েক কিলোমিটার। হাটার পথ পাহাড়ী ছড়া ও জঙ্গলাকৃত খাড়া পাহাড়।গিরিখাতের সৃষ্টি প্রাকৃতিকভাবে দুটি পাহাড়ের ঢালে জলধারা প্রবাহে মাটি ক্ষয় হয়ে গিরিখাতের সৃষ্টি হয়। আর হাজার হাজার বছর জলধারা প্রবাহিত হয়ে এর দু পাশ খাড়া পাথরে পরিনত হয়। এই পানির ক্রমাগত ধারায় পাহাড়ের গায়ে সৃষ্টি হয় মনমাতানো কারোকাজ। যা দেখতে হুবুহু বিশ্বে আবিস্কৃত অনান্য গিরিখাতের মতো। গিরিখাত হিসেবে এটি আবিস্কারের পর গণমাধ্যমে প্রকাশের জন্য একটি নামের প্রয়োজন হয়। মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক নাজিয়া শিরিণ ও স্থানীয় বনবাসীদের সাথে আলাপ করে নামকরণ করি নিসর্গ গিরিধারা। গিরি শব্দের অর্থ পাহার বা পর্বত।